সাকরাইন উৎসবে একদিন

”হ্যাপি সাকরাইন” দিয়ে এ বছর চমকে দিয়েছিল ফেসবুক কর্তৃপক্ষ। চার বন্ধু মিলে দুপুরেই চলে গিয়েছিলাম প্রথমবারের মত এই উৎসবে সামিল হতে। ওই দিন শাঁখারিবাজারে পা রাখতেও ছিল চমক। বাকাট্টা বাকাট্টা চিৎকারে ছেলে-বুড়ো সবার কেটে যাওয়া ঘুড়ি ধরার প্রতিযোগিতা সবখানে। আকাশে ঘুড়ি দোকানে ঘুড়ি, এ যেন ঘুড়ির রাজ্য। শাঁখারিবাজার তাঁতিবাজারসহ পুরান ঢাকার প্রায় সব এলাকাতেই সাকরাইন উৎসবের দিন এই দৃশ্যই থাকে সারাদিন।

পৌষ সংক্রান্তি উৎসব সাকরাইন। যদিও ১ মাঘেই উদযাপিত হয় এই উৎসব। এলাকাবাসী জানালো আদি পঞ্জিকামতে সংক্রান্তি পালন করা হয়। এ দিন প্রায় প্রতিটি বাড়ির ছাদে থাকে ঘুড়ি কাটাকাটি খেলার প্রতিযোগিতা। আকাশে হাজারো রঙের রঙিন ঘুড়ি। মেয়েরা এ দিনে বাপের বাড়ি বেড়াতে আসে। আগে জামাইদের হাতে নাটাই ঘুড়ি দিয়ে বরণ করা হতো। এখনও সেই রীতি ধরে রাখার চেষ্টা করছে এখানকার মানুষ। হিন্দুধর্মানুসারীরা এই দিন পৌষ সংক্রান্তি পূজা করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তানভির বলেন, এ উৎসব সব ধর্ম নির্বিশেষে পুরান ঢাকার মানুষের আত্মার সাথে মিশে আছে বলেই আমরাও এর ভাগীদার হতে পেরেছি। শাঁখারিবাজারের বিভিন্ন দোকানে সেদিন ঘুড়ির ছবি তুলছিলেন আমেরিকান নাগরিক জেমস ও তাঁর সঙ্গীরা। জেমস বলেন, আমরা আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে এ উৎসব দেখতে এসেছি। তাঁদের বাঙালি বন্ধু খালেদ জানান পর্যটন খাতে এ উৎসব অনেক বড় সম্ভাবনা হতে পারে, যদি আমরা আরেকটু খেয়াল রাখি। রাস্তায় ও ছাদে আরো অনেক বিদেশি পর্যটকদের দল বেঁধে ছবি তুলতে দেখা গেল।

মাঞ্জা দেওয়া সূতার ধারে কেটে গেলেও রঙিন ঘুড়িরা আকাশ দখল করে থাকলো সন্ধ্যা পর্যন্ত। অন্ধকার নামতেই আকাশপ্রদীপ হয়ে উড়ে গেল হাজারো ফানুস। সঙ্গে নানা বর্ণের আতশবাজি। সে এক অপূর্ব দৃশ্য! মুখে কেরোসিন নিয়ে তৈরি আগুনের গোলাগুলোও ছিল অন্যতম আকর্ষণ।

এলাকাবাসীর মতে আগের রীতি অনেকটাই বদলে গেছে। এখন ছাদে ছাদে ছেলেরা ডিজে পার্টিও করে। এখানকার বাড়ির ছাদগুলো এই দিন সবার জন্য খোলা থাকে। প্রজাপতি, পানদার, চক্ষুদার, পঙ্খীরাজসহ নানা নামের ঘুড়ির দেখা মিললো দোকান ঘুরে। ‘পৌষ সংক্রান্তির এ উৎসব শুরু ঠিক কবে হয়েছিল জানিনা, তবে মোঘল আমল থেকে ঘুড়ি ওড়ানোর এই রীতি উৎসবে পরিণত হয়।’ বলছিলেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শ্যামল কান্তি রায়। ইতিহাস ঘেটে জানা গেল নবাবি আমলে ১৭৪০ সালে শুরু হয় সাকরাইন নামে ঘুড়ির উৎসব। তখন হিন্দু ধর্মের লোকেরাই পালন করত এই উৎসব। কালের বিবর্তনে সাকরাইন এথন সার্বজনীন উৎসব।

পুরান ঢাকার সদরঘাট, লালবাগ, দয়াগঞ্জ, বাংলাবাজার, ধূপখোলা মাঠসহ সব এলাকাতেই সাকরাইন পালন করা হয়।

Photo Credit: Safayet Hossain.

(Visited 41 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *