ছায়াসঙ্গম

চুমুর আক্ষেপ নিয়ে কলিংবেল বাজাচ্ছি। নিয়ম মাফিক ভেতর থেকে ছোটবোন দরজা খুলে দিলো। মাঝে মাঝে মনে হয়, পৃথিবীতে কেবলমাত্র এই একটি কারনেই ছোটবোনদের জন্ম হওয়া উচিত। বড় ভাইদের একমাত্র ভরসার স্থল, সে যত দেরি করেই ঘরে ফিরুক না কেন কলিংবেলের আওয়াজ শুনে পৃথিবীর যাবতীয় কাজ ফেলে সোহাগী ছোট বোনটি এক দৌড়ে দরজা খুলে দেবে। যথারীতি দরজা খোলার পর তার চোখেও হেমন্তের সন্ধ্যায় ঘাসের পাতায় জন্মানো শিশিরের মতো অস্পষ্ট কিশোরী আক্ষেপের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। এমন আক্ষেপের সাথে আজই নতুন পরিচয় নয়। ফুলটুসের (ছোটবোনকে যে নামে ডাকি) ঘন কালো মসৃন চুলের জন্য একটি প্রজাপতি ক্লিপ কিনবো বলে গত সাত দিন ধরে তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাইরে বেরুই। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে একটার পর একটা সিগেরেট খেতে খেতে পকেটের সব টাকা ফুরিয়ে গেলেই মনে পড়ে ফুলটুসের প্রজাপতি ক্লিপ কেনা আজ আর সম্ভব না। ঘরে ফিরেই তার টোল পরা অভিমানী চকোলেট গালে চিমটি কেটে বলি, “ফুলটুস একদম ভুলে গেছিরে! কাল তোর প্রজাপতি ক্লিপ না নিয়ে ঘরে ঢুকবো না দেখিস!” সে আমার মুখের কাছে লাঙলের আগার মতো ছুচালো নাক নিয়ে এসে বলে- “গু খেতে তো ভুলো না একদিনও। “গু” মানে হলো সিগেরেট। ফুলটুসের ধারণা , সিগেরেটে যে পরিমাণ দূর্গন্ধ সত্যিকারের মানুষের বা কুকুরের গু’তেও তার ১০ শতাংশ গন্ধ থাকে না। আমার খুব ইচ্ছে একদিন ফুলটুসকে একটা ম্যনথল গু (সিগেরেট) খাওয়াবো। ও প্রায়ই জিজ্ঞেস করে এটা খেলে কী হয়? আমি বিজ্ঞানসম্মতভাবে সৃজনশীল পদ্ধতিতে গু খাওয়ার উপকারিতা, অপকারিতা ও কার্যকারীতা সম্পর্কে বিরাট লেকচার শুনাই। নিজেকে অনেক বিজ্ঞ মনে হয়, সেও পীথাগোরাসের উপপাদ্যের মতো মন দিয়ে শুনে ও আমার লেকচার বুঝার চেষ্টা করে। কিন্তু কাজ হয়না। রাজকুমারী দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, জীবনেও সে গু খাবেনা।

পা টিপে টিপে খুব সাবধানে নিজের ঘরের দিকে এগোই। আব্বা-আম্মা’র বেডরুম থেকে বেশ কিছু আক্ষেপের সুতীব্র ভাসমান ঘ্রান নাকে এসে লাগে। আম্মা’র আক্ষেপ, তিনি এখনো একটি দোতলা বাড়ির মালিক হতে পারলেন না। ভাড়া বাড়িতে থাকতে থাকতে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। ছোটবেলায় আম্মার ইচ্ছে ছিলো তিনি হাই স্কুলের শিক্ষিকা হবেন। ইংরেজী পড়াবেন। বিশেষ করে “ইংলিশ ফর টুডে” বইটি ছাত্র-ছাত্রীদের যত্ন করে পড়াবেন। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় সেই ইচ্ছেটা গুড়ে বালি না বলে বরং গুড়ে কাদা বলাই উত্তম। বড়বেলাতেও আম্মার একটা ইচ্ছে গাড় হয়ে জেকে বসেছে মাথায়। তিনি একদিন এই মফস্বল শহরে একটি দোতলা বাড়ির বাড়িওয়ালি হবেন। ভাড়াটিয়াদের সাথে তিনি কখনো খারাপ ব্যবহার করবেন না। এদেশে যেসব অপরাধের বিচার করার জন্য সাংবিধানিক কোন আইন নেই তার মধ্যে একটি হচ্ছে বাড়িওয়ালী কর্তৃক ভাড়াটিয়াদের নির্যাতনের বিচার। এগুলো বিচারবহির্ভুত অপরাধ। আম্মা সবসময় গল্প করেন, তিনি বাড়িওয়ালি হলে কোন ভাড়াটিয়ার সাথে মটরের পানি নিয়ে খ্যাচ-খ্যাচ করবেন না। পানি হলো একটি পবিত্র ও জরুরী সামগ্রী। তার মতে এটা নিয়ে বাড়িওয়ালিদের খ্যাচ-খ্যাচ করা কবীরা গুণাহ। যদিও এরকম কোন হাদিস আম্মা কোথাও পড়েন নি। দেয়ালে মশারী টানানোর জন্য ভাড়াটিয়াদের দেয়াল ফুটো করতে হবে না। বাড়ি বানানোর সময় সকল বন্দোবস্ত করে রাখবেন, যাতে করে ভাড়াটিয়াদের কষ্ট করতে না হয় ।আজকাল আমারো খুব ইচ্ছে জাগে নিজের মা’কে বাড়িওয়ালী হিশেবে দেখতে কেমন দেখাবে? আমাকেও বাড়িওয়ালির সন্তান হিশেবে কতটুকু মানাবে? আমার উচ্চতা কি বাড়বে? গায়ের রংটা কি উজ্জ্বল শ্যামলা হবে? এ শহরে বাড়িওয়ালীর সন্তান হওয়ার মধ্যেও আলাদা গর্বের ব্যপার আছে।

আব্বার আক্ষেপটা আরো তীব্র ঝাঝালো গন্ধযুক্ত আমোনিয়া গ্যাসের মতো। তার ধারণা আমি ছাড়া পৃথিবীতে দ্বিতীয় কোন শিক্ষিত বেকার নেই। একসময় প্রচুর ঝগড়া হতো এ নিয়ে। আমাদের ঝগড়ার ধরণটা বেশ মজার। অনেকটা বয়স পেরোনো বিবাহযোগ্য মাস্টার্স পাশ প্রেমিকার সাথে বেকার প্রেমিকের যে ঝগড়া সেরকম। আব্বা প্রেমিকা চরিত্রে। সেই সূত্রমতে আমি তার দীর্ঘদিনের বেকার প্রেমিক। সুবিধামতো চাকরি জোটাতে না পারায় প্রেমিকার সম্মানিত পিতার সামনে দাঁড়ানো সম্ভব হচ্ছেনা। এদিকে একের পর এক সরকারী-বেসরকারী, দেশী-প্রবাসী, স্মার্ট সম্ভ্রান্ত পরিবারের পাত্রকে বিভিন্ন উপায়ে আমার রুপসী প্রেমিকা ফিরিয়ে দিচ্ছেন। আমার অবশ্য এরকম কোন প্রেমিকা কোন কালেই ছিলো না। তবে শ্রদ্ধেয় পিতার অপার কৃপায় এধরনের একটি অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পেরে পিতার প্রতি আমি খুব কৃতজ্ঞ। নিজেকে যথেষ্ট পোড় খাওয়া প্রেমিক মনে হচ্ছে। আমার এখন উচিত একটি দূর্দান্ত বিরহের কাব্যগ্রন্থ লিখে বাংলা সাহিত্যে নিজের অবস্থানটা আরো দৃঢ় করা। কিন্তু বর্তমানে এতো এতো কবি আর কবিতাগ্রন্থের ভিড়ে এই কাজ করাটা অনেক দুঃসাধ্য ব্যপার। এরচেয়ে বরং ঢাকা শহরে কোন এক গার্মেন্টস এ সেলাই এর কাজে লেগে যেতে পারি। ছোটবেলায় বাংলা সিনেমাতে দেখেছি প্রচন্ড অভিমানে আর প্রতিশোধপরায়ন হয়ে নায়ক জসিম, আলমগীর প্রমুখেরা গার্মেন্টসের চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারি থেকে খুব অল্প সময়ে ও অলৌকীক সততায় গার্মেন্টসের মালিক হয়ে গেছেন । সে যাইহোক, আজ অনেকদিন হলো আব্বা আমার সাথে কথা বলেন না। প্রেমিকা হলে ভাবতাম আমার দারুণ অলসতা, জীবনবাস্তবতার প্রতি তীব্র খামখেয়ালীপনায় অতিষ্ট হয়ে আমার প্রতি সকল কোমল স্পর্শ, আহ্লাদ, ভালবাসাকে ঘৃণায় রুপান্তরিত করে নির্ভরযোগ্য কোন পুরুষের দিকে ঝুকে গেছে। সন্তানের প্রতি পিতার নীরব অভিমান তেমন আতংকের বিষয় না। তিনি তো আর আমার উপর অভিমান করে ৫৫ বছর বয়সে নতুন করে বিয়ে করে ফেলবেন না। বড়জোর বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারেন। আমিও সেই ধরনের প্রস্তুতি নিয়েই ঘরে ঢুকি। বন্ধু, শুভাকাংখিদের বলে রেখেছি – যেকোন সময় চলে আসবো দোস্ত। সবাইকে তো আর বলা যাবে না যে বাপে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। বলবো বেড়াতে আসছি। অনেকদিন দেখিনা তোদের।

বাইরে থেকে অতিরিক্ত সিগেরেট আর ভাঁজাপোড়া খাওয়ায় পেটের ভেতর একটি গ্যাস চেম্বার সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে জানান দিলো আজকে আর ভাত খাবার জো নেই। রাতের খাবার না খেয়েই ঘরে ঢুকে এনার্জি বাল্ব জ্বালানোর জন্য সুইচ অন করলাম কিন্তু আমি ভুলেই গেছিলাম যে দুইদিন ধরে ঘরের বাল্ব নষ্ট । ওয়ারেন্টি কার্ড থাকা সত্বেও আলসেমীর কারনে দোকান থেকে চেঞ্জ করা হয়নি। তাছাড়া, বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারীং পাশ করে এসব কাজ করতে ভালো লাগে? আম্মাকে এই কথাটা আমি কিছুতেই বুঝাতে পারিনি গত দুইদিনে। আলো জ্বালাবার জন্য কিচ্ছু না পেয়ে দক্ষিণের জানালাটা খুলে দিলাম। পাশের বাড়ির শিমু ভাবীদের বেলকনির আলো এসে আমার ঘরের একটু অংশে আলো দিচ্ছে। সেই আলোতে শার্ট খুলবার জন্য হাত উঁচু করলাম। সাথে সাথে আমার সামনেও একজন তার জামা খুলবার জন্য হাত উঁচু করলো। আমি শার্টের নিচে সাদা সেন্টু গেঞ্জি খুললাম, সেও তার অন্তর্বাস খুললো। আমি কিঞ্চিত উত্তেজিত হয়ে দ্রুত গতিতে জিন্সের প্যানটাও খুলে ফেললাম। ওমা সে কী! সেও খুলে ফেললো। আমি তার উপর ঝাপিয়ে পড়লাম, সেও আমার উপর। আমি তাকে চুমু খাচ্ছি, সেও আমাকে চুমু খাচ্ছে আমারি মতন করে। আমরা উত্তেজনার সর্বোচ্চ সীমায় পৌছাতেই আচমকা একটা চিৎকার শুনতে পেলাম । তড়িঘরি করে দুজনেই উঠে পড়লাম। আমি জানালার পাশে গিয়ে দেখি শিমু ভাবী ফ্লোরে পরে আছে। সম্ভবত তিনি এতক্ষন আমাকে আমার ছায়ার সাথে সঙ্গমরত অবস্থায় দেখে আতংকীত হয়ে জ্ঞান হারিয়েছেন। আমার প্রচন্ড লজ্জ্বা আর ঘৃণা জন্মালো নিজের উপর। ছিঃ আমি কী করে শিমু ভাবির সামনে মুখ দেখাবো? শিমু ভাবী নিশ্চই এই কথা তার স্বামীকে বলবে? তার স্বামীকে বলার সময় কান পেতে কাজের বুয়াটাও শুনবে। কাজের বুয়াকে সবাই বিবিসি নিউজ বলে ডাকে এলাকায়। কাজের বুয়া শুনা মানেই পুরো এলাকায় বাড়ি বাড়ি রটে যাওয়া। এরপর বাড়ি থেকে খেলার মাঠ, খেলার মাঠ থেকে স্কুল কলেজে। চায়ের দোকানে, স্টেশনে, নদীর পাড়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে আমি আমার ছায়ার সাথে সঙ্গম করি। আমি কোথাও বেরুতে পারবো না। সব ফেসবুকার রা এই ঘটনা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দেবে। কেউ কেউ বলবে আমি পাগল, উন্মাদ। যৌনবিকৃত মস্তিষ্কের অধিকারী বলে অনেকেই আমার ছবি আপলোড করে ঘ্যান্না প্রকাশ করতে পারে। উফফফ! এত এত লজ্জ্বা নিয়ে, ঘৃণা নিয়ে আমি বাকী দিনগুলো কীভাবে বেঁচে থাকবো ?

এতক্ষণ জানলাটা বন্ধ ছিলো। কোথায় গেলো ছায়াটা ? এত দিন কোন নারী আমাকে চরিত্রহীন করতে পারলো না। অথচ এই ছায়াটা আমার বেঁচে থাকা দুর্বিষহ করে দেবে? কিছুতেই মেনে নিতে পারছিনা। জানালাটা খুলে দিলাম। ওমনি ছায়াটা আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি তার গলা চেপে ধরার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। এরপর বুঝতে পারলাম এভাবে হবে না। ছায়াগুলো খুব পিচ্ছিল হয়। তাই, দ্রুত নিজের গলাটা চেপে ধরলাম। ছায়াও তার গলাটা চেপে ধরলো। ছায়াগুলো গাধার চেয়েও বোকা হয় এই প্রথম জানলাম। আমি জোরে চাপ দিচ্ছি, সেও জোরে চাপ দিচ্ছে। আমি গোঙাচ্ছি, সেও গোঙাচ্ছে। আমি কাপতে কাপতে মাটিতে পরে গেলাম, সেও আমার সাথে মাটিতে পরে গেলো। এরপর আমার আর কিচ্ছু মনে নেই। ছায়াটা কি সম্পূর্ণ মরে গিয়েছিলো নাকি আধ মরা হয়ে আমার মতো হাসপাতালে শুয়ে আছে?

-ছায়াসঙ্গম
নিকুঞ্জ, খিলক্ষেত, ঢাকা।

Art: “Approaching Shadow”, by Fan Ho, Photography, 1954

(Visited 286 times, 1 visits today)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *